ড্রাসেনা এমন একটি ঘরোয়া গাছ, যা খুব বেশি যত্ন ছাড়াই ঘরের সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিতে পারে। লম্বা, ছড়ানো ও রঙের বৈচিত্র্য থাকা পাতার কারণে এটি সহজেই নজর কাড়ে। একই সঙ্গে নতুন গাছপ্রেমীদের জন্যও এটি বেশ ভালো একটি পছন্দ, কারণ ড্রাসেনা তুলনামূলক কম যত্নে মানিয়ে নিতে পারে। ড্রাসেনার একটি পরিচিত প্রজাতির বৈজ্ঞানিক নাম Dracaena fragrans। দেখতে অনেকটা ছোট ভুট্টাগাছের কাণ্ডের মতো হওয়ায় একে অনেক সময় ভুট্টাগাছও বলা হয়। এটি “ম্যাস কেইন” নামেও পরিচিত।
ড্রাসেনার একশটিরও বেশি জাত রয়েছে এবং জাতভেদে এদের আকার, পাতার রং ও গঠনে পার্থক্য দেখা যায়। Dracaena reflexa প্রাকৃতিক পরিবেশে প্রায় ১৮ ফুট পর্যন্ত লম্বা এবং ৮ ফুট পর্যন্ত চওড়া হতে পারে। আবার Dracaena deremensis তুলনামূলক কম যত্নেও টিকে থাকতে পারে। “লাকি ব্যাম্বু” নামে পরিচিত গাছটিও আসলে ড্রাসিনার একটি প্রজাতি, যার বৈজ্ঞানিক নাম Dracaena sanderiana। এটি পানিতেও বেড়ে উঠতে পারে। অল্প যত্নে ঘরের কোনো কোণকে আরও সবুজ ও আকর্ষণীয় করে তুলতে চাইলে ড্রাসেনা হতে পারে দারুণ একটি পছন্দ।
ড্রাসেনা গাছ সম্পর্কে কিছু কথা
ড্রাসেনার বিভিন্ন প্রজাতি সাধারণত দুই ধরনের গঠনে দেখা যায়। কিছু ড্রাসেনা ছোট গাছের মতো লম্বা হয়ে ওঠে, আবার কিছু জাত ঝোপের মতো ছড়িয়ে বাড়ে। ঝোপের মতো জাতগুলো ঘরের ভেতরে রাখার জন্য বিশেষভাবে জনপ্রিয়। ড্রাসেনা অ্যাসপারাগাস পরিবারের একটি গাছ। এই গাছের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ হলো এর পাতা। পাতাগুলো সাধারণত লম্বা, সরু ও কিছুটা তীক্ষ্ণ ধরনের হয়। জাতভেদে পাতায় শুধু সবুজ নয়, লালচে-বাদামি বা হালকা গোলাপি রঙের ছাপও দেখা যেতে পারে। নাসার ১৯৮০-এর দশকের একটি গবেষণায় কিছু ঘরোয়া গাছের বাতাসে থাকা নির্দিষ্ট দূষক শোষণের ক্ষমতা নিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছিল। সেই গবেষণায় ড্রাসেনার মতো গাছও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
আলো
ড্রাসেনা উজ্জ্বল কিন্তু সরাসরি নয়, এমন আলো সবচেয়ে বেশি পছন্দ করে। জানালার কাছাকাছি এমন জায়গায় রাখা ভালো যেখানে পর্যাপ্ত আলো আসে, কিন্তু তীব্র রোদ সরাসরি পাতায় পড়ে না। তবে ড্রাসেনার একটি বড় সুবিধা হলো, এটি কম আলোর পরিবেশেও অনেকটা মানিয়ে নিতে পারে। তাই ঘরের ভেতরের কক্ষ বা কার্যালয়েও এটি রাখা যায়।
তীব্র সরাসরি রোদ ড্রাসেনার পাতার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। বিশেষ করে দুপুরের কড়া রোদে পাতায় পোড়া দাগ পড়তে পারে। পাতায় কালো বা বাদামি দাগ দেখা দিতে পারে, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে পাতার রং অস্বাভাবিকভাবে কমলা বা লালচে হয়ে যেতে পারে। তাই এমন জায়গা বেছে নিন যেখানে গাছটি পর্যাপ্ত আলো পাবে, কিন্তু কড়া রোদ থেকে নিরাপদ থাকবে।
পানি
ড্রাসেনাকে পানি দেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মাটি কিছুটা শুকানোর সুযোগ দেওয়া। মাটির ওপরের অংশ স্পর্শ করে শুকনো মনে হলে এবং টবের মাটির বেশিরভাগ অংশ শুকিয়ে এলে পানি দিতে পারেন। পানি দেওয়ার সময় ভালোভাবে পানি দিন, যেন টবের নিচের ছিদ্র দিয়ে অতিরিক্ত পানি বের হয়ে যায়। টবের নিচের পাত্রে পানি জমে থাকলে অবশ্যই ফেলে দিন। শিকড় দীর্ঘ সময় পানির মধ্যে থাকলে গাছের ক্ষতি হতে পারে।
ড্রাসেনাকে অতিরিক্ত পানি দেওয়া উচিত নয়। একবার পানি দেওয়ার পর প্রতিদিন আবার পানি দেওয়ার প্রয়োজন নেই। সাধারণভাবে কয়েক দিন পর মাটি পরীক্ষা করে তারপর সিদ্ধান্ত নেওয়া ভালো। অতিরিক্ত পানি পেলে গাছের পাতা হলুদ হয়ে যেতে পারে এবং গাছ কিছুটা ঝিমিয়ে পড়তে পারে।
আর্দ্রতা
ড্রাসেনা উষ্ণ অঞ্চলের গাছ হওয়ায় কিছুটা আর্দ্র পরিবেশ পছন্দ করে। তবে আর্দ্রতা বাড়ানোর জন্য বেশি পানি দেওয়া ঠিক নয়। ঘরের বাতাস খুব শুষ্ক হলে পাতায় হালকা পানি ছিটিয়ে দেওয়া যেতে পারে। বিশেষ করে শুষ্ক আবহাওয়ায় এটি গাছকে সতেজ রাখতে সাহায্য করতে পারে। পাতায় হালকা পানি ছিটালে ধুলো জমাও কিছুটা কমে। চাইলে গাছের আশপাশের বাতাসে আর্দ্রতা বাড়ানোর যন্ত্র ব্যবহার করা যেতে পারে। আরেকটি সহজ উপায় হলো অগভীর একটি পাত্রে ছোট নুড়ি বিছিয়ে কিছু পানি রাখা। পানি শুকিয়ে গেলে আবার ভরে দিতে হবে।
তাপমাত্রা
ড্রাসেনা সাধারণ ঘরের আরামদায়ক তাপমাত্রায় ভালো থাকে। অতিরিক্ত ঠান্ডা পরিবেশ এড়িয়ে চলাই ভালো। কিছু ড্রাসেনা বাইরে রেখেও বড় করা যায়, তবে ঠান্ডা এলাকায় তুষারপাতের আশঙ্কা থাকলে গাছটি ঢেকে রাখা বা নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়া উচিত। ঘরের ভেতরে রাখলে এমন জায়গা বেছে নিন যেখানে হঠাৎ খুব ঠান্ডা বাতাস বা তাপমাত্রার বড় পরিবর্তন হয় না।
মাটি
ড্রাসেনার জন্য এমন মাটি ব্যবহার করুন যেখান থেকে অতিরিক্ত পানি সহজে বের হয়ে যায়। সাধারণ টবের মাটির মিশ্রণেও এই গাছ ভালোভাবে মানিয়ে নিতে পারে, যদি পানি বের হওয়ার ব্যবস্থা ঠিক থাকে। ড্রাসেনা তুলনামূলক ধীরে বাড়ে। তাই খুব বেশি সার দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। সার ব্যবহার করলে স্বাভাবিক মাত্রার অর্ধেক পরিমাণে পাতলা করে দেওয়া ভালো। অতিরিক্ত সার ব্যবহার না করাই নিরাপদ।
পাতার ডগা বাদামি হয়ে যায় কেন?
ড্রাসেনার একটি খুব পরিচিত সমস্যা হলো পাতার একেবারে ডগা বাদামি হয়ে শুকিয়ে যাওয়া। দেখতে কিছুটা খারাপ লাগলেও এটি সব সময় গাছের বড় কোনো সমস্যার লক্ষণ নয়। অনেক ক্ষেত্রে কলের পানিতে থাকা ক্লোরিন, লবণ বা কিছু খনিজের কারণে পাতার ডগায় এমন সমস্যা দেখা দিতে পারে। এ ধরনের সমস্যা বারবার হলে বিশুদ্ধ পানি বা পরিষ্কার বৃষ্টির পানি ব্যবহার করে দেখতে পারেন।
ড্রাসেনায় কি পোকা হয়?
ড্রাসেনায় সাধারণত খুব বেশি পোকার আক্রমণ দেখা যায় না। তবে কখনো কখনো সাদা তুলোপোকা, জাবপোকা বা থ্রিপস আক্রমণ করতে পারে। এগুলো পাতার ক্ষতি করতে পারে এবং গাছকে ধীরে ধীরে দুর্বল করে দিতে পারে। তাই সময়ে সময়ে পাতার নিচের অংশ, পাতার গোড়া এবং গাছের আশপাশ ভালোভাবে পরীক্ষা করুন। শুরুতেই পোকা শনাক্ত করতে পারলে নিয়ন্ত্রণ করা অনেক সহজ হয়।
নতুন গাছপ্রেমীদের জন্য ড্রাসেনা কেমন?
নতুন গাছপ্রেমীদের জন্য ড্রাসেনা খুব ভালো একটি পছন্দ। এর যত্ন তুলনামূলক সহজ এবং সামান্য ভুল হলেও অনেক সময় গাছটি আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে পারে। ড্রাসেনার যত্ন নিতে মূলত ঘরোয়া গাছের কয়েকটি সাধারণ বিষয় জানলেই যথেষ্ট। যেমন, কখন পানি দিতে হবে, কোথায় রাখলে ভালো আলো পাবে এবং অতিরিক্ত পানি যেন টবে জমে না থাকে। খুব বেশি সময় বা জটিল পরিচর্যা ছাড়াই সুন্দর একটি গাছ ঘরে রাখতে চাইলে ড্রাসেনা বেশ উপযোগী। নিজের জন্য যেমন ভালো, তেমনি নতুন কোনো গাছপ্রেমীকে উপহার হিসেবেও ড্রাসেনা সুন্দর একটি পছন্দ হতে পারে।
শেষ কথা
ড্রাসেনার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো এর সুন্দর পাতা এবং সহজ যত্ন। নতুন গাছপ্রেমী হোন বা দীর্ঘদিন ধরে গাছের যত্ন নিন, দুজনের জন্যই এই গাছটি উপভোগ্য। উজ্জ্বল কিন্তু সরাসরি নয় এমন আলো দিন, মাটি কিছুটা শুকানোর পর পানি দিন, টবে পানি জমতে দেবেন না এবং সাধারণ ঘরের পরিবেশে রাখুন। এই কয়েকটি সহজ বিষয় খেয়াল রাখলেই ড্রাসেনা দীর্ঘদিন সুন্দর ও সতেজ রাখা সম্ভব। ঘরের কোনো খালি কোণে সহজ যত্নের একটি সুন্দর সবুজ গাছ রাখতে চাইলে ড্রাসেনা হতে পারে চমৎকার একটি পছন্দ।
বৃক্ষ ডট কম থেকে আপনার পছন্দের ড্রাসেনা গাছটি সংগ্রহ করুন।