গাছে পোকা হয় কেন?
গাছে পোকা হওয়া মানেই গাছের যত্ন ঠিকমতো নেওয়া হয়নি বা পরিবেশ অপরিষ্কার, এমন নয়। প্রকৃতির স্বাভাবিক অংশ হিসেবেই বিভিন্ন পোকামাকড় গাছে আসতে পারে। অনেক সময় নতুন গাছ কেনার সময়ই খুব ছোট অবস্থায় পোকা বা তাদের ডিম গাছের সঙ্গে চলে আসে। চোখে ভালোভাবে দেখলেও সেগুলো ধরা নাও পড়তে পারে। আবার গাছ দুর্বল বা চাপের মধ্যে থাকলেও পোকার আক্রমণ বাড়তে পারে। যেমন:
- প্রয়োজনের তুলনায় কম আলো পাওয়া
- অতিরিক্ত পানি দেওয়া
- প্রয়োজনের তুলনায় কম পানি দেওয়া
- বাতাসে আর্দ্রতা ঠিক না থাকা
- দীর্ঘদিন গাছের পাতা ও কাণ্ড পরীক্ষা না করা
- তাই গাছকে সুস্থ রাখার পাশাপাশি নিয়মিত পাতা, কাণ্ড এবং পাতার নিচের অংশ পরীক্ষা করা ভালো।
আঁশপোকা কী?
আঁশপোকা ঘরের গাছে দেখা যাওয়া একটি সাধারণ রসচোষা পোকা। এরা গাছের গায়ে শক্তভাবে আটকে থাকে এবং দেখতে অনেকটা ছোট মাছের আঁশ বা বাদামি রঙের ছোট উঁচু দাগের মতো মনে হয়। এদের শরীরের ওপর মোমের মতো একটি শক্ত আবরণ তৈরি হয়। এই আবরণই পোকাটিকে বাইরের আঘাত ও অনেক ধরনের কীটনাশক থেকে রক্ষা করে। আঁশপোকা গাছের কাণ্ড বা পাতায় আটকে গাছের ভেতরের রস চুষে খায়। দীর্ঘদিন এভাবে চলতে থাকলে গাছ ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে।
আঁশপোকা গাছের কী ক্ষতি করে?
আঁশপোকা গাছের রস খাওয়ার কারণে আক্রান্ত গাছে কয়েকটি লক্ষণ দেখা যেতে পারে। পাতা ধীরে ধীরে হলুদ হয়ে যেতে পারে, গাছ নিস্তেজ হয়ে পড়তে পারে এবং পাতাগুলো কিছুটা ঝুলে যেতে পারে। বেশি আক্রমণ হলে গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। গাছের কাণ্ড ও পাতায় ছোট ছোট শক্ত বাদামি বা ধূসর দাগের মতো কিছু দেখতে পেলে ভালোভাবে পরীক্ষা করুন। অনেক সময় এগুলো ময়লা মনে হলেও আসলে আঁশপোকা হতে পারে।
সাধারণভাবে আঁশপোকাকে দুই ধরনের বলা যায়—
- কঠিন খোলসওয়ালা আঁশপোকা
- নরম খোলসওয়ালা আঁশপোকা
কঠিন খোলসওয়ালা আঁশপোকার ওপরের আবরণ এতটাই শক্ত যে সরাসরি কোনো তরল কীটনাশক ছিটিয়ে দিলে সেটি সহজে পোকার শরীরে পৌঁছাতে পারে না। নরম খোলসওয়ালা আঁশপোকার ক্ষেত্রে তরল প্রতিকার কিছুটা বেশি কার্যকর হতে পারে। এই কারণেই শুধু ওষুধ ছিটানোর পরিবর্তে প্রথমে চোখে দেখা পোকাগুলো সরিয়ে ফেলা বেশি কার্যকর।
আঁশপোকা দূর করার উপায়:
আঁশপোকা নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে ভালো উপায় হলো চোখে দেখা পূর্ণবয়স্ক পোকা সরিয়ে ফেলার পর বাকি ছোট পোকাগুলোর জন্য উপযুক্ত তরল ব্যবহার করা।
প্রথমে গাছের পাতা ও কাণ্ড ভালোভাবে পরীক্ষা করুন। চোখে দেখা আঁশপোকাগুলো আলতোভাবে ঘষে বা তুলে সরিয়ে ফেলুন। পুরোনো ও মৃত আঁশপোকা তুলনামূলক সহজে উঠে আসে। জীবিত আঁশপোকা গাছের সঙ্গে শক্তভাবে আটকে থাকে, তাই এগুলো সরাতে একটু বেশি যত্ন নিতে হতে পারে। সব পূর্ণবয়স্ক পোকা সরিয়ে ফেললেও সমস্যা পুরোপুরি শেষ হয়েছে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। কারণ খুব ছোট বাচ্চা পোকা গাছের অন্য অংশে ছড়িয়ে থাকতে পারে। এগুলো এত ছোট যে খালি চোখে সহজে দেখা যায় না।
তবে ভালো খবর হলো, ছোট অবস্থায় আঁশপোকা তুলনামূলক দুর্বল থাকে। তাই চোখে দেখা পোকাগুলো সরিয়ে ফেলার পর কীটনাশক সাবান ও নিম তেল ব্যবহার করা যেতে পারে। প্রয়োজনে কয়েক দিন পর আবার গাছ পরীক্ষা করে একই ব্যবস্থা নিতে হবে।
শুধু ছিটানো ওষুধে কেন কাজ নাও হতে পারে? পূর্ণবয়স্ক আঁশপোকার শরীর শক্ত মোমের আবরণে ঢাকা থাকে। ফলে বাইরে থেকে ছিটানো তরল অনেক সময় সরাসরি পোকাটির শরীরে পৌঁছাতে পারে না।বিশেষ করে কঠিন খোলসওয়ালা আঁশপোকার ক্ষেত্রে এই সমস্যা বেশি দেখা যায়। তাই সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হলো, প্রথমে চোখে দেখা পোকা সরিয়ে ফেলুন, তারপর নিম তেল বা কীটনাশক সাবান ব্যবহার করুন। এতে পূর্ণবয়স্ক পোকা এবং চোখে না দেখা ছোট পোকা, দুই ধরনের আক্রমণই নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়।
প্রকৃতিতে আঁশপোকা সব গাছ ধ্বংস করে না কেন?
ঘরের ভেতরে আঁশপোকা বিরক্তিকর হয়ে উঠলেও প্রকৃতিতে এদের বেশ কিছু শত্রু রয়েছে। কিছু পাখি খুব সহজেই গাছের গায়ে থাকা আঁশপোকা শনাক্ত করে খেয়ে ফেলে। আঁশপোকা একবার গাছের সঙ্গে আটকে গেলে খুব বেশি চলাফেরা করতে পারে না, তাই পাখির জন্য এগুলো সহজ খাবার। এছাড়া বিভিন্ন ধরনের গুবরে পোকাও আঁশপোকা খায়। তাদের শক্ত মুখের অংশ আঁশপোকার শক্ত আবরণ ভেঙে ফেলতে পারে। ঘরের ভেতরে এই প্রাকৃতিক শিকারি না থাকায় আঁশপোকা তুলনামূলক সহজে সংখ্যা বাড়াতে পারে।
আঁশপোকা এক গাছ থেকে অন্য গাছে কীভাবে ছড়ায়?
পূর্ণবয়স্ক আঁশপোকা খুব বেশি চলাফেরা করে না। তাই সাধারণত এরা নিজেরা দ্রুত এক গাছ থেকে অন্য গাছে ছড়াতে পারে না। তবে ছোট বাচ্চা পোকাগুলো কিছুটা চলাফেরা করতে পারে এবং কাছাকাছি থাকা অন্য গাছে চলে যেতে পারে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নতুন আক্রান্ত গাছ ঘরে আনার মাধ্যমেই আঁশপোকা অন্য গাছের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। বাতাসের মাধ্যমেও খুব ছোট পোকা ছড়াতে পারে, তবে ঘরের পরিবেশে এটি তুলনামূলক কম ঘটে। তাই নতুন গাছ কিনে আনার পর কয়েক দিন অন্য গাছ থেকে আলাদা রেখে ভালোভাবে পরীক্ষা করা নিরাপদ।
কোন গাছে আঁশপোকা বেশি দেখা যায়?
আঁশপোকা সাধারণত মোটা, শক্ত ও রসালো পাতা বা কাণ্ডযুক্ত গাছ বেশি পছন্দ করে। বিশেষ করে:
- স্নেক প্ল্যান্টজাতীয় মোটা পাতার গাছ
- বিভিন্ন ধরনের ক্যাকটাস
- রসালো পাতার গাছ
- বার্ডস নেস্ট ফার্নজাতীয় গাছ
এ ধরনের গাছে আঁশপোকার আক্রমণ তুলনামূলক বেশি দেখা যেতে পারে। অন্যদিকে খুব পাতলা পাতার গাছে এরা সাধারণত কম আগ্রহ দেখায়। খুব শক্ত বাকলযুক্ত অংশেও সহজে বসতে পারে না। তবে কাঠজাতীয় গাছের নতুন ও নরম অংশে আক্রমণ করতে পারে।
ভবিষ্যতে আঁশপোকার আক্রমণ কীভাবে কমাবেন?
সম্পূর্ণভাবে পোকামাকড় ঠেকানো সবসময় সম্ভব নয়, তবে কিছু অভ্যাস আক্রমণের ঝুঁকি অনেক কমিয়ে দিতে পারে। নিয়মিত গাছের পাতা ও কাণ্ড পরীক্ষা করুন। বিশেষ করে পাতার নিচের অংশ, নতুন কুঁড়ি এবং কাণ্ডের সংযোগস্থল ভালোভাবে দেখুন। নতুন গাছ কিনে আনার পর সঙ্গে সঙ্গে অন্য গাছের পাশে না রাখাই ভালো। কয়েক দিন আলাদা রেখে পর্যবেক্ষণ করুন। এছাড়া প্রতিটি গাছের প্রয়োজন অনুযায়ী:
- পর্যাপ্ত আলো দিন
- সঠিক পরিমাণে পানি দিন
- অতিরিক্ত পানি জমতে দেবেন না
- উপযুক্ত আর্দ্রতা বজায় রাখুন
- গাছকে যতটা সম্ভব সুস্থ ও চাপমুক্ত রাখুন
- সুস্থ গাছ সাধারণত পোকার আক্রমণ অনেক ভালোভাবে সামলে নিতে পারে।
আঁশপোকা কি মানুষ বা পোষা প্রাণীর জন্য ক্ষতিকর?
গাছের আঁশপোকা বিরক্তিকর হলেও সাধারণত মানুষ বা পোষা প্রাণীর জন্য ক্ষতিকর নয়। এদের মূল লক্ষ্য গাছের রস খাওয়া। তাই আঁশপোকা দেখলে আতঙ্কিত হওয়ার দরকার নেই। দ্রুত আক্রান্ত গাছটিকে অন্য গাছ থেকে আলাদা করুন, চোখে দেখা পোকাগুলো সরিয়ে ফেলুন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নিম তেল বা কীটনাশক সাবান ব্যবহার করুন।
শেষ কথা
আঁশপোকা ঘরের গাছের একটি সাধারণ সমস্যা। শুরুতেই শনাক্ত করতে পারলে নিয়ন্ত্রণ করাও তুলনামূলক সহজ। সবচেয়ে সহজ নিয়মটি মনে রাখুন: চোখে দেখা আঁশপোকা আগে সরিয়ে ফেলুন, এরপর নিম তেল বা কীটনাশক সাবান ব্যবহার করুন এবং কয়েক দিন পর আবার গাছ পরীক্ষা করুন। একই সঙ্গে গাছকে সঠিক আলো, পানি ও আর্দ্রতা দিলে গাছ সুস্থ থাকবে এবং ভবিষ্যতে পোকার আক্রমণের ঝুঁকিও অনেকটাই কমে যাবে।
