
গাছে পোকা আসে কেন?
গাছে পোকা হওয়া খুবই স্বাভাবিক। এর মানে এই নয় যে গাছ অপরিষ্কার বা আপনি গাছের যত্ন ঠিকভাবে নিচ্ছেন না। অনেক সময় নতুন গাছ কেনার সময়ই পাতার নিচে বা ছোট কোনো ফাঁকে পোকা ও তাদের ডিম লুকিয়ে থাকতে পারে। ভালোভাবে দেখলেও সেগুলো চোখে নাও পড়তে পারে। গাছ দুর্বল থাকলেও পোকার আক্রমণ বাড়তে পারে। পর্যাপ্ত আলো না পাওয়া, বেশি বা কম পানি দেওয়া এবং গাছের জন্য ঠিক আর্দ্রতা না থাকলে গাছ দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই নিয়মিত গাছ পরীক্ষা করার পাশাপাশি প্রতিটি গাছের প্রয়োজন অনুযায়ী আলো, পানি ও আর্দ্রতা নিশ্চিত করা জরুরি।
স্পাইডার মাইট কী?
স্পাইডার মাইট খুবই ছোট একটি প্রাণী, যা অনেকটা মাকড়সার মতো এবং পাতার ওপর খুব সূক্ষ্ম জাল তৈরি করতে পারে। তবে সাধারণ মাকড়সার জালের মতো বড় ও পরিষ্কার জাল এরা তৈরি করে না। এদের জাল অনেক পাতলা এবং কখনো পাতার ওপর হালকা কাপড়ের আস্তরণের মতো মনে হএরা খুব ছোট ও হালকা হওয়ায় বাতাসের সাহায্যেও এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে পারে। কাপড়ের সঙ্গেও লেগে যেতে পারে। বিশেষ করে গরমের সময় এদের আক্রমণ বেশি দেখা যায়। জানালা খোলা থাকলে বাতাসের সঙ্গেও এরা ঘরে এসে গাছে বসতে পারে। এদের বংশবৃদ্ধিও বেশ দ্রুত। ডিম থেকে পূর্ণ অবস্থায় যেতে প্রায় দুই সপ্তাহের মতো সময় লাগতে পারে। তাই শুরুতেই ব্যবস্থা না নিলে অল্প সময়ের মধ্যে একটি গাছে অনেক স্পাইডার মাইট ছড়িয়ে পড়তে পারে।
গাছের কোথায় বেশি থাকে?
স্পাইডার মাইট সাধারণত পাতার নিচে থাকতে বেশি পছন্দ করে। তাই গাছ পরীক্ষা করার সময় শুধু পাতার ওপরের অংশ দেখলে হবে না। একটি পাতা স্থির করে নিচের অংশ খুব ভালোভাবে দেখলে ছোট ছোট বিন্দুর মতো কিছু ধীরে ধীরে নড়তে দেখা যেতে পারে। বিশেষ করে পাতার নিচে, নতুন পাতায়, পাতার গোড়ায় এবং ডালের সংযোগস্থলে ভালোভাবে খুঁজে দেখুন।
স্পাইডার মাইট গাছের কী ক্ষতি করে?
স্পাইডার মাইট পাতার কোষ থেকে রস শুষে খায়। এর ফলে পাতার স্বাভাবিক রং ও শক্তি ধীরে ধীরে কমতে থাকে। আক্রমণের শুরুতে পাতায় অনেক ছোট ছোট সাদা বা হলদে দাগ দেখা দিতে পারে। পরে দাগগুলো ছড়িয়ে যায় এবং পাতার রং অসমান হয়ে পড়ে। পাতা কুঁকড়ে যেতে পারে এবং বেশি আক্রান্ত হলে পাতার কোমল অংশ নষ্ট হয়ে শুধু শিরার মতো অংশ স্পষ্ট দেখা যেতে পারে। কখনো পাতার ওপর ধুলোর মতো আস্তরণও দেখা যায়। গাছ পরিষ্কার করার পরও যদি পাতাকে অস্বাভাবিক ধুলোময় মনে হয়, তাহলে পাতার নিচে স্পাইডার মাইট আছে কি না দেখে নিন।
কোন গাছে বেশি আক্রমণ হতে পারে?
স্পাইডার মাইট আলো পছন্দ করে। তাই সরাসরি রোদ পাওয়া গাছের নতুন ও কচি পাতায় এদের আক্রমণ বেশি হতে পারে। সব গাছও এদের কাছে সমান পছন্দের নয়। কিছু গাছের গন্ধ ও পাতার স্বাভাবিক উপাদান এদের বেশি আকর্ষণ করে। যেমন, একই জায়গায় পামজাতীয় গাছ ও রাবার গাছ থাকলে এরা আগে পামজাতীয় গাছে আক্রমণ করতে পারে। একটি গাছে খাবার কমে গেলে পরে পাশের অন্য গাছেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
স্পাইডার মাইট দূর করবেন কীভাবে?
স্পাইডার মাইট দেখা গেলে প্রথমেই আক্রান্ত গাছটি অন্য গাছ থেকে আলাদা করে রাখুন। এতে পাশের সুস্থ গাছে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কমবে। এরপর পাতার ওপর ও নিচের অংশ নরম কাপড় দিয়ে ভালোভাবে মুছে পরিষ্কার করুন। যতটা সম্ভব পোকা এবং তাদের তৈরি জাল সরিয়ে ফেলুন। গাছটি পানি সহ্য করতে পারলে হালকা পানির প্রবাহ দিয়ে পাতার ওপর ও নিচের অংশ ধুয়েও নিতে পারেন। এই ধাপটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ স্পাইডার মাইটের তৈরি জালের মধ্যে পোকা ও ডিম লুকিয়ে থাকতে পারে। জাল ভালোভাবে পরিষ্কার না করলে পরে ব্যবহার করা ওষুধ সব জায়গায় পৌঁছাতে পারে না এবং কিছুদিন পর আবার আক্রমণ শুরু হতে পারে।
পরিষ্কার করার পর কী ব্যবহার করবেন?
গাছ পরিষ্কার করার পর নিম তেল অথবা স্পাইডার মাইট দমনের জন্য উপযোগী কীটনাশক সাবান ব্যবহার করা যেতে পারে। শুধু পাতার ওপর ছিটিয়ে দিলে হবে না। পাতার নিচের অংশে ভালোভাবে ব্যবহার করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি পাতার গোড়া, নতুন পাতার ভাঁজ, ডালের ফাঁক এবং যেসব জায়গায় পোকা লুকিয়ে থাকতে পারে, সেসব জায়গাতেও ভালোভাবে পৌঁছাতে হবে। কোনো অংশ বাদ পড়ে গেলে সেখানে থাকা পোকা বা ডিম থেকে আবার আক্রমণ শুরু হতে পারে।
আক্রমণ বেশি হলে তিন দিন পরপর গাছ পরীক্ষা করে প্রয়োজন অনুযায়ী আবার ব্যবহার করা যেতে পারে। মূল পরিচর্যা পদ্ধতিতে নয় দিনের মধ্যে মোট তিনবার ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। তবে আপনি যে নিম তেল বা কীটনাশক সাবান ব্যবহার করছেন, তার গায়ে লেখা ব্যবহারের নিয়ম অবশ্যই পড়ে নিবেন।
গন্ধক কি ব্যবহার করা যায়?
স্পাইডার মাইট দমনে গন্ধক বেশ কার্যকর। তবে ঘরের ভেতরে রাখা গাছে সাধারণভাবে এটি ব্যবহার না করাই ভালো। ঘরের গাছের ক্ষেত্রে নিম তেল বা উপযুক্ত কীটনাশক সাবান ব্যবহার করা তুলনামূলক সহজ।
আক্রান্ত গাছ আলাদা রাখা কেন জরুরি?
স্পাইডার মাইট খুব ছোট ও হালকা। বাতাস, কাপড় কিংবা কাছাকাছি থাকা গাছের পাতার মাধ্যমে এরা অন্য গাছে চলে যেতে পারে। তাই একটি গাছে স্পাইডার মাইট দেখা গেলে সেটিকে অন্য গাছ থেকে কিছুদিন আলাদা রাখুন। পাশাপাশি আশপাশের গাছগুলোর পাতার নিচেও ভালোভাবে পরীক্ষা করুন। সূক্ষ্ম জাল, ছোট ছোট ফ্যাকাশে দাগ বা নড়তে থাকা ছোট বিন্দু দেখা যাচ্ছে কি না খেয়াল করুন।
ভবিষ্যতে স্পাইডার মাইটের আক্রমণ কমাবেন কীভাবে?
নিয়মিত গাছ দেখাশোনা করাই সবচেয়ে ভালো উপায়। সপ্তাহে অন্তত একবার পাতার নিচের অংশ, নতুন পাতা এবং ডালের ফাঁকগুলো দেখে নিন। শুরুতেই কয়েকটি পোকা ধরা পড়লে খুব সহজেই সরিয়ে ফেলা যায়। পাতায় ধুলো জমতে দেবেন না। সময় সময় পাতাগুলো নরম কাপড় দিয়ে পরিষ্কার করুন। এতে পাতা সুন্দর ও সতেজ থাকার পাশাপাশি পোকা বা জালও দ্রুত চোখে পড়বে। নতুন গাছ কিনে আনার পর সঙ্গে সঙ্গে অন্য গাছের পাশে না রেখে কিছুদিন আলাদা করে পর্যবেক্ষণ করাও ভালো অভ্যাস। একই সঙ্গে গাছের প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক পরিমাণ আলো ও পানি দিন এবং উপযুক্ত আর্দ্রতা রাখুন। সুস্থ গাছে বড় ধরনের পোকার আক্রমণের ঝুঁকিও তুলনামূলক কম থাকে।
স্পাইডার মাইট কি মানুষ বা পোষা প্রাণীর ক্ষতি করে?
স্পাইডার মাইট গাছের জন্য ক্ষতিকর হলেও মানুষ বা পোষা প্রাণীর জন্য ক্ষতিকর নয়। এরা মানুষের শরীর থেকে খাবার নেয় না; গাছের পাতার রস খেয়েই বেঁচে থাকে। তাই গাছে স্পাইডার মাইট দেখলে ভয় পাওয়ার প্রয়োজন নেই। দ্রুত আক্রান্ত গাছটি আলাদা করে পাতা ও জাল পরিষ্কার করুন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিন। পোকা চলে যাওয়ার পরও ক্ষতিগ্রস্ত পুরোনো পাতা আবার আগের মতো হয়ে যাবে না। গাছকে সুস্থ হয়ে ওঠার জন্য কিছুটা সময় দিন। নতুন ও সুন্দর পাতা বের হওয়া শুরু করলে বুঝবেন গাছটি ধীরে ধীরে সুস্থ হচ্ছে।
শেষকথা
স্পাইডার মাইট আকারে খুব ছোট হলেও দ্রুত বংশবৃদ্ধি করতে পারে এবং সময়মতো ব্যবস্থা না নিলে গাছের পাতার বড় ক্ষতি করতে পারে। তাই পাতায় খুব পাতলা জাল, ছোট সাদা বা হলদে দাগ, ধুলোর মতো আস্তরণ কিংবা কুঁকড়ে যাওয়া দেখলে পাতার নিচের অংশ ভালোভাবে পরীক্ষা করুন। সহজভাবে তিনটি বিষয় মনে রাখুন, আক্রান্ত গাছটি অন্য গাছ থেকে আলাদা করুন, পাতা ও জাল ভালোভাবে পরিষ্কার করুন এবং এরপর নিম তেল বা উপযুক্ত কীটনাশক সাবান ব্যবহার করুন। নিয়মিত গাছ পরীক্ষা করা এবং সঠিকভাবে যত্ন নেওয়ার অভ্যাসই স্পাইডার মাইটসহ বিভিন্ন পোকার বড় আক্রমণ থেকে আপনার প্রিয় গাছগুলোকে নিরাপদ রাখার সবচেয়ে সহজ উপায়।